
টাটকা তাজা স্মৃতির ঝালাই
জনপ্রিয়তার হ্যালোজেন টাওয়ারটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিতে ও বরাবরই শচীন তেন্ডুলকার। আসর জমাতেও ও চিরদিনের হেক্কর। ‘বিশ সাল বাদ’ও ‘পোতিভা’য় মরচে ধরেনি একটুও। মোক্ষম সময়েই আর একটা সেঞ্চুরি। —‘লে টাটকা লে, তাজা পোনা, ট্যাংরা, ভোলা’।
শুকুর ওই একটা হুঙ্কারেই গুমসুম নির্জনতা সব ফুসমন্তর। সাংঘাতিক বেশি ভদ্রতার পরিবেশ থেকে উচ্ছেদ করে মুহূর্তেই সকলকে নিয়ে গিয়ে যেন ফেললো বিশ বছর আগের সেই ‘মাছের বাজার’-এ। বিদ্যাসাগর কলেজের এই চত্বরটাকে তখন তো এই নামেই ঈর্ষা করতো সেসময়ের অন্য কলেজগুলো।
‘হাই’, ‘হ্যালো’র মৃদু গুঞ্জনের দঙ্গলটা যেন হঠাৎ করেই অনেকটা সাবলীল। কোথাও কারোর অনধিকার প্রবেশ নয়। ভেতরের আনুষ্ঠানিক পুনর্মিলনের উৎসব ছাপিয়ে শঙ্কর ঘোষ লেন জুড়েই তখন বাঁধন ছাড়া রি-ইউনিয়নের ডাউন মেমোরি লেন। চেনা, একটু একটু চিনতে পারার আগল ভেঙে সকলেরই তখন অবাধ বিচরণ। নাম মনে নেই, তো ভি কুছ পরোয়া নেই। বন্ধুত্বের ভাষা তো বদলায় না। ইডেনে গোটা একটা ক্রিকেট ম্যাচ পেছনের সিটে বসে দেখলেও যে গোলুর সাথে কথা হয়নি, কিংবা বাসের পাশাপাশি সিটে যে দেবুর সাথে আধঘন্টা কথা হলেও একবারও নাম উচ্চারণ হয়নি, আজ তো আর সেই নাম মনে করার তাগিদ নেই। তাই নানা কথা হলেও এমন চার-পাঁচজনের নামটা আর মনে করে নেওয়া হলো না। পাঁচ বছরের কলেজ লাইফে যে মেয়েটা কিংবা ছেলেটার সাথে একদিনও কথা হয়নি, আজ সেও অনেক খোলামেলা। সম্পর্কের বাঁধন ছিঁড়ে যাওয়া নিয়েও তেমন অস্বস্তি নেই ফার্স্ট ইয়ার 923 –র (শর্মিষ্ঠাকে তো শুরুতে ঐ নামেই ডাকা হতো, মাফ করিস যদি রোল নম্বরটা ভুল বলে থাকি)। ঝিঙে-আলু-পোস্তর কেন্টাকলি (কাকলি)ও ফিরে গেছে সেই হ্যা হি হি তেই। শুধু পাশে নেই বরাবরের লাফিং পার্টনার ‘বলিস না’ (সুস্মিতা)। তারই মাঝে আড়াল খুঁজে সোমদ্যুতির সিগারেটে সুখ টান। সাংঘাতিক বেশি ভদ্রতার মুখোশ ঝেড়ে ফেলতে সি রুমটাকেই বানিয়ে ফেলা গেলো রি-ইউনিউনের অস্থায়ী মঞ্চ। জীবনের সবচেয়ে সুন্দরবেলার সেরা মুহূর্তগুলির নেশায় তখন সকলেই কেমন বুঁদ হয়ে আছে। কে কার সঙ্গে বাড়ি যেত, কে কাকে বাড়ি পৌঁছে দিত, কে কে ন্যাশনালে আলাদা খোপে বসতো। আবার মার্কাস স্কোয়ারের ফুটবল থেকে কমন রুমের মিক্সড ডাবলস। তারই মধ্যে বেহালার করুণ সুর খানিকটা পুরোনো এ পাড়ার বদলে যাওয়া ছবি। কানাই দার চায়ের দোকান থেকে লাল রকের অবলুপ্তি—বেশি হা হুতাশ যেন তা নিয়েই।
কাজের তাড়া ‘এমু’ যদুকে অনেক আগেই আসর ছাড়া করলো। রয়ে গেলো মোম, ছবি তোলার সেশন জারি রাখতে। রং-তুলিতে সাবলীল অঞ্জনকেও দেখা গেলো ডিজিটাল হাতে ‘রেডি’ হাঁকতে। পিচে পড়েই যার বল বিষাক্ত ইনসুইং নিয়ে ঢুকে যেতো সেই অশোক তখন সোচ্চার ঘন ঘন এমন আড্ডার দাবিতে। ওদিকে গৌর তখন তাঁর ছেলের মা, সহপাঠী মধুমিতাকে চাপাচাপি শুরু করেছে, ‘আজকের দিনটার জন্য অন্তত আমাকে ‘তুই’ বল!’ তারই মধ্যে নীলার ‘সুনজরের’ চোখ নিয়ে শুরু হলো কুট-কাচালি, অবশ্যই মহিলা মহলে, প্রকাশ্যে সরাসরি। চিল চিৎকারের স্লোগান তোলা অনুপকে চুপচাপ দেখে তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, ‘ওর কি গলা খারাপ?’ জ্যাঠা চাঁদু অবশ্য বরাবরের মতোই ‘পাঁচজনের মধ্যে একেবারে পঞ্চম’, নীরবে জানান দিয়ে চলেছে। একই রকম জানান দিলো অনীত, পাশে থেকে। দেবাশিষ আগের মতোই মিষ্টি। যে মিষ্টি স্বভাবের কারণে কলেজ শুরুতে ইচ্ছা না থাকলেও ওর অন্য রাজনীতির ডাকে সরাসরি ‘না’ বলা হয়নি।
ঢ্যাঙা জয়দীপটা এলো অনেকটা দেরিতে। সমাজসেবা সেরে বিশ্ব যখন পৌঁছালো, হাট তখন গুটোতে শুরু করেছে। সরকারী ডিউটি ছেড়ে বোতল চশমার (এখন অবশ্য পাতলা কাঁচের, রহস্যটা জানা হয়নি) টম সরকারকেও ডেকে আনা গেলো একেবারে শেষ বেলায়।
ফোন বন্ধ রেখে কথা রাখলো না পাপা। এলো না থপথপ কল্লোল। শুভটার সাথে যোগাযোগই করা গেলো না। কলেজে গম্ভীর মুখোশ চড়িয়ে থাকা, গোপনে রামচ্যাঙড়া অনুপমের নাম কারণে অকারণে উঠলেও ওর আসার উপায় নেই। ও তো আমাদের থেকে পাঁচ ঘন্টা এগিয়ে। টেলিফোনে রাঁচিতে ধরা গেলো চল্লিশেই বুড়ি তনুশ্রীকে, বেশ খানিকটা খচেই গেলো, সশরীরে না থাকতে পারায়, যাক মোবাইলে রি-ইউনিয়নে থাকলো।
এই মোবাইল-ইন্টারনেট নির্ভর যুগে এ দুরত্ব ঠিক কত, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তা না হলে মাত্র চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে এই গেট টুগেদারটা আদৌ করা যেত কি?
বয়স মুখের ত্রিকোণমিতি খুব একটা বদলাতে না পারলেও খানিকটা সুখ আর খানিকটা অসুখ সকলেরই বডির সেন্টার অব গ্র্যাভিটিকে টেনে এনে ফেলেছে শরীরের মধ্যপ্রদেশে। তবে চেনা দায় কেমিস্ট্রির অভিজিৎকে, বহর যা বাড়িয়েছে। (এই বিজ্ঞানটা আবার দেখলাম জেণ্ডার সেন্সিটিভ। অন্তত আমাদের প্রমীলা বাহিনী তেমনই জানান দিচ্ছে।)
আর ব্যাতিক্রম সেই দীপুদা, গুরুদেব এখনও এভার গ্রিন। পরশু রাতে ওর ফোনটা না এলে হয়তো এই স্মৃতির ঝালাইটা হতোই না। এর জন্য ওকে ধন্যবাদ নয়, কথা রাখার গ্যারান্টিটাই বরং আরো একবার করি।— হপ্তায় হপ্তায় নয়, মাসে অন্তত একবার দেখা হবে। আশা রাখি, সকলেই চেষ্টায় থাকবে। দেখা যাক...
লেখাটা অসাধারণ। মুহূর্তে মনে পড়ে গেলো হেদুয়া-িববেকানন্দ রোড ধরে গিরিশ পার্ক ছাড়িয়ে সোনাগাছির গা ধরে শোভাবাজারে। একটু এগোলেই কুমারটুলি,পিছন দিকে গঙ্গার দিকে পা বাড়ালেই পাঁচ টাকায় মিলে যেতে দুটো বাংলার ছোট পাঁইট।
ReplyDeleteঅথবা একেকদিন হেভি খিদে পেতেই বিদ্যাসাগরে গিয়ে ঘুগনি রুটি।একদম বিন্দসাস!শালা দু’টাকায় পেট ভরে একসা। অথবা কোনদিন সিটি কলেজের ক্যান্টিন। মোগলাই পরোটা দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হয়তো বহুত কষ্ট হয়েছে কিন্তু গুরু মাত্র এক টাকায় শশার খোসা,বাসি বিট-গাজরের গোলাপি কমলা আভা আর পেঁয়াজের ঝাঁঝ। ফুল অমৃত বস।
চল একদিন শুধুু পায়ে হেঁটে কোনকিছুর প্রত্যাশা না করে ওই চত্বরে ঘুরে আসি। এখানে বসে থাকতে থাকতে ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’হয়ে গেছি,তারপরেও যেটুকু বাকি আছে সেটা নিয়ে আবার পুরনোর স্মৃতির গলিতে হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীর ধূসর মুখ খুঁজলে ক্ষতিই বা কী আছে!
বস!সত্যি মনটা আজ খারাপই হয়ে গেলো!