রায় শুনেই ক্রুদ্ধ অর্ধমৃত মানুষ পুলিসের কর্ডন ভাঙলেন
সাধনা কারণিক: ভোপাল
৭ই জুন — রায় শুনেই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন হামিদা বি আর শান্তি দেবীরা। শীর্ণ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে পুলিসের কর্ডন ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা করলেন আব্দুল কাদির, শামসাদ বি-রা। মুহূর্তের স্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে পঙ্গু হয়ে যাওয়া, অর্ধমৃত নারী পুরুষ আর ন্যায়বিচারের দাবিতে লড়ে যাওয়া হাজারো মানুষ স্লোগান তুললেন অপরাধীদের ফাঁসি দাও। আমেরিকার দালাল মনমোহন সিং মুর্দাবাদ।
দীর্ঘ ২৬বছর ধরে বিচার করে বিষ গ্যাসে ১৫হাজারের বেশি মানুষকে খুনের শাস্তি মাত্র ২বছরের জেল আর সোয়া লক্ষ টাকা জরিমানা! বছরের পর বছর চোখের সামনে পরপর প্রজন্মকে ধুঁকতে ধুঁকতে মরতে দেখা মানুষগুলো কিছুতেই মানতে পারেনি আজকের রায়। তাঁদের সরাসরি অভিযোগ, অপরাধীদের বাঁচাতেই সি বি আই কেস হালকা করে দিয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত ইউনিয়ন কার্বাইডের চেয়ারম্যান এবং সি ই ও ওয়ারেন অ্যান্ডারসেনকে ফেরার ঘোষণা করে তাকে কোনো শাস্তিই দেওয়া হলো না। আজকের দিনটিকে ‘কালো দিন’ বলে আদালত চত্বরে তুমুল বিক্ষোভ দেখায় গ্যাস পীড়িতরা।
এদিন সকাল থেকেই ভোপাল জেলা সদর দায়রা আদালতের সামনে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। সেই ভিড়ে গ্যাসকাণ্ডে পঙ্গু হয়ে যাওয়া মানুষদের পাশাপাশি ভোপাল গ্যাস পীড়িত সংযোগ সংঘর্ষ সমিতিসহ এতদিন ধরে যে সব সংগঠন গ্যাস পীড়িতদের জন্য লড়াই করে আসছিলো তারাও হাজির ছিলো। সারা দেশ-দুনিয়ার সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরাও হাজির ছিলেন। গোটা দুনিয়ায় এ যাবৎ শিল্পক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী যারা তাদের কী শাস্তি হলো, সকলেই জানতে আগ্রহী। সকাল থেকেই বিশাল পুলিস বাহিনী কর্ডন করে ঘিরে রেখেছিলো আদালত চত্বর। চড়া রোদে ঠায় দাঁড়িয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংজ্ঞাহীন হয়ে যান। চারদিক ঢাকা গাড়িতে করে অভিযুক্তদের নিয়ে আসে পুলিস। রায় ঘোষণার সাথে সাথেই তারা জামিন পেয়ে যায়।
এই রায়ের পর স্বাভাবিক কারণেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন উপস্থিত জনতা। পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধ আব্দুল কাদির দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। সেদিন রাতের মারণ গ্যাস কেড়ে নিয়েছে স্ত্রী আর পুত্র কন্যাকে। চিৎকার করে বলছিলেন, কোনো ক্ষতিপূরণ চাই না। খুনীদের ফাঁসি চাই। সি বি আই দাও কেমিক্যালের হয়ে কাজ করেছে। বলতে বলতেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন বৃদ্ধ কাদির। অপরাধীদের বের করে নিয়ে যাওয়ার সময়ে পুলিসের গাড়ি ঘিরে ধরেন গ্যাস পীড়িতরা। তীব্র ক্ষোভে পায়ের জুতো-চটি খুলে ধেয়ে যান গাড়ির দিকে।
একইভাবে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিভিন্ন আন্দোলনকারী সংগঠনের কর্মীরাও। বছর পঁচিশের যুবক রাজেশ নামদেও বললেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই অ্যান্ডারসেনকে ছাড় দিতে সি বি আই মামলা হালকা করেছে। মার্কিন নাগরিক অ্যান্ডারসেনকে বাঁচাতে আর এই বহুজাতিকগুলি যাতে ভবিষ্যতেও বিনা বাধায় ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে ওয়াশিংটন থেকে সেরকমই নির্দেশ আছে। এখন গোপন বোঝাপড়ায় দাও কেমিক্যালের দরজা খুলে দেওয়ার চেষ্টায় আছে কেন্দ্র। কয়েক দিন আগেই জয়রাম রমেশ এসে এখানে ওদের হয়ে ওকালতি করেছে। রাজ্যের বি জে পি সরকারও এদের শাগরেদ হয়েছে।
ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার ঠিক বিপরীতেই জে পি নগরের বাসিন্দা শামসাদ বি গ্যাসকাণ্ডে হারিয়েছিলেন পাঁচ বছরের ছেলে আর শাশুড়িকে। ২৬বছর ধরে খুনীদের শাস্তির অপেক্ষায় দিন গুনছেন। আজ রায় শুনেই প্রথমে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারপর চিৎকার করে ওঠেন, ‘ভোটের সময় কংগ্রেস আর বি জে পি-র নেতারা টাকা নেয় এই খুনীদের থেকে, আমরা সব জানি। তাই কংগ্রেস হোক বা বি জে পি কোনো সরকারই আমাদের কথা ভাবে না।’
ভোপাল গ্যাস পীড়িত সংঘর্ষ সহযোগ সমিতি এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে এবং সুপ্রিম কোর্টে মামলা করবে। একই কথা জানিয়েছে আন্দোলনরত অন্য সংগঠনগুলিও। কেন সি বি আই এই মামলা হালকা করলো তার তদন্ত করার জন্য যৌথ সংসদীয় কমিটির মতো একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে ভোপাল গ্যাস পীড়িত সংঘর্ষ সহযোগ সমিতি।
সমিতি বলেছে, এদিনের রায়ের ফলে ভবিষ্যতে কোনো পরমাণু সংস্থায় দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় থেকে ঐ সংস্থাকে মুক্ত করারও ব্যবস্থা পাকা করা হলো। অর্থাৎ পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন সংস্থাগুলি এদেশে যে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি গড়ে তুলবে সেখানে এধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের কোনো দায় থাকবে না। এবিষয়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও দাবি করেছে তারা। পাশাপাশি ভোপাল গ্যাস পীড়িত সংঘর্ষ সহযোগ সমিতি জানিয়ে দিয়েছে, গত ২৬বছর ধরে ন্যায় বিচারের দাবিতে লড়াই যেমন চলছে, তেমনই চলবে। কাল, পরশুর মধ্যেই আরো বড় আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে।
No comments:
Post a Comment