Tuesday, June 8, 2010

Bhopal Verdict

ইনসাফকে কবর দিতে দেবো না

সাধনা কারণিক : ভোপাল

৮ই জুন— সকাল থেকে আর খবরের কাগজের পাতা উলটোতে ইচ্ছে হয়নি। কাল থেকে নিজেকে কেবল ‘একটা প্রতারিত’, ‘একটা বোকা’র বেশি কিছু মনে হচ্ছে না।

ছাব্বিশটা বছরের লড়াই যেন আদালতের একটা কলমের খোঁচাতেই শেষ।

আদালত কী রায় শোনাতে পারে যদিও জানাই ছিল। জানাই ছিল, এতগুলি বছর অপেক্ষার পরও মিলবে না সুবিচার। গ্যাস পীড়িতদের নতুন করে আর কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যে আশা নেই, তাও অজানা ছিল না।

তবু এক অজানা আশায় বুক বেঁধে কাল গিয়েছিলাম চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের সামনে। মনের কোনো এক কোণে যেন অবাস্তব এক স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছিল, যে শয়তানগুলো আমাদের গোটা শহরটাকে এক রাতে গ্যাস চেম্বারে পুড়ে দিয়েছিল, হয়তো তাদের একটা উচিত শাস্তি হবে। সেই স্বপ্নটাই হয়তো উসকে দিয়েছিল উর্মিলা বাঈ, সামসাদ বি, সোহনলাল, ইদ্রিশ আলিদের পঙ্গু শরীরটাকে। ‘অপাহিজ’ তকমা পাশে ঠেলে রেখে মানুষগুলি কাল ১৪৪ধারা ভেঙে ‘খণ্ডযুদ্ধ’ লড়ে গিয়েছিল পুলিসের সাথে। দলে দলে গ্যাস পীড়িত মহিলারা পায়ের জুতো হাতে তুলে তেড়ে গিয়েছিল প্রিজন ভ্যানের দিকে। কর্ডন ভেঙে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল ঘাতক-আসামীদের।

সেই ‘অপাহিজ’ প্রতিরোধকে দমিয়ে দিতে পুলিসকে অবশ্য বিশেষ গা ঘামাতে হয়নি। সি বি আই-র ‘বদান্যতায়’ আদালতে ‘সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের’ সরকারী গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই তাদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া গেছে। সে দৃশ্য দেখে ওখানেই হামিদা বি বলছিল, দেখো মনে হচ্ছে আমরাই অপরাধী, আর ওরা ‘গ্যাস পীড়িত’।

কাল রাতে যখন জে পি নগরের ঘুপচি বস্তিতে গেলাম, তখনও রাগে ফুঁসছে গোটা মহল্লাটা। —‘এ তো গুরু পাপে লঘু দণ্ড। একটা রাতও ওদের জেলে কাটাতে হলো না।’ কেউ বললো, ‘একটা ভোপাল হয়েছিল চুরাশির ডিসেম্বরে। আরেকটা ঘটে গেলো ৭ই জুন, ২০১০-এ।’ কেউ বলছে, ‘আর রাঘব বোয়ালটা ছাড়ই পেয়ে গেলো।’ অথচ কাল সকাল থেকে যে মানুষের জটলা আদালত ঘিরে ফেলেছিল, তাঁদের সকলের মুখেই ছিল ‘অ্যাণ্ডারসনকো ফাঁসি দো।’

রাতে বাড়ি ফিরে টেলিভিশনে দেখছিলাম কেন্দ্রের আইনমন্ত্রী বলছেন, ‘বিচারকে কবর দেওয়া হয়েছে।’ তাঁকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম না, ‘কে দিল কবর? কারা অ্যাণ্ডারসনকে গ্রেপ্তার করেও কদিন বাদেই পঁচিশ হাজার টাকার জামিনে দেশ থেকে পালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল? কারা সি বি আই-কে দিয়ে মামলাটা লঘু করে দিয়েছে?’

আজ দুপুরে কোন চ্যানেলে যেন দেখলাম রঘু রাই বলছেন, সি বি আই হলো পোষা বলদ। ঐ গোয়েন্দা সংস্থা তখনই কাজ করে যখন ওদের বাধ্য করা হয়। বলছিলেন, এমনভাবে তথ্যপ্রমাণগুলি দুর্বল করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও ন্যায় বিচার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

যে মানুষটির তোলা এক মৃত শিশু দেহের ছবি এতগুলি বছর ‘গ্যাস পীড়িত’ না হয়েও আমাদের মতো লোকগুলোকে তাঁদের লড়াইয়ে পাশে থাকার শক্তি জুগিয়েছে, সেই রঘু রাই বিচারের এই প্রহসন দেখে যেন অনেকটাই ভেঙে পড়েছেন।

আজ সকাল পর্যন্ত আমাদেরও মনের অবস্থা এমনটাই ছিল। মনে হচ্ছিল, দায়রা আদালতেই লেগে গেলো ছাব্বিশ বছর! এরপর হয়তো হাইকোর্ট, সেখানে না হলে সুপ্রিম কোর্ট। না জানি, আরো কত কত বছর!

দুপুরে কাচ্চি মহল্লায় পৌঁছে অবশ্য সেই হতাশা থেকে উঠে এলো নতুন লড়াইয়ের ‘প্ররোচনা’। দুর্ঘটনার বিষের ছোবলে অন্ধ চোখ, বিষে ভরা ফুসফুস আর পঙ্গু সন্তান নিয়ে জীবনের হাপর টানতে থাকা রাশিদা বি, কমলা বাঈরা তৈরি হচ্ছেন নতুন করে পথে নামার জন্য। তার মধ্যেই খবর এসে গেলো, আজও শহরের জায়গায় জায়গায় বিক্ষোভ-প্রতিবাদের। জানা গেলো, এর মধ্যেই কারা যেন রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টে গেছে।

লড়াইয়ের আঁতুড় ঘরে বসে এই লড়াইয়ের প্রস্তুতির খবরে আবার যেন মনটা চাঙ্গা।

পাশের টেবিলে পড়ে থাকা দৈনিক ভাস্করে চোখ পড়লো। হেডিং হয়েছে, ‘দফন হুয়া ইনসাফ।’

আবারও ভেসে উঠলো রঘু রাইয়ের সেই ছবি, আর লড়াইয়ের ইচ্ছেটা।

না, ইনসাফকে কবর দিতে দেব না।

No comments:

Post a Comment